banner

নিলয় হত্যার বিচার চাওয়াও সরকার বিরোধী ষড়যন্ত্র

NewsWorld365 NewsWorld365 , August 8, 2015
niloy

মাসকাওয়াথ আহসান

কারো কোন বিষয়েই লেখা কোন অপরাধ নয়। পড়ার এবং লেখার স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। সুতরাং অপরাধ হচ্ছে লেখার দায়ে তাকে হত্যা করা বা ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে স্তব্ধ করে দেয়া। একজন সামান্য ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদের সমালোচনা যেখানে গ্রেফতারযোগ্য অপরাধ; সেই অন্ধকার সমাজে ধর্মের সমালোচনা করাও হত্যাযোগ্য অপরাধ বলেই গণ্য হয়। রাজনীতির লালসালুর মাজারের মজিদের সমালোচনা এবং ধর্মের লালসালুর মাজারের মজিদের সমালোচনা দুটোই এ বাংলাদেশ বরফযুগে ব্লাসফেমাস।

ধারাবাহিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডর জের ধরে ব্লগার নিলয় খুন হলেন নিজ বাসগৃহে। তার ফেসবুক স্টেটাস থেকে জানা যায়, এর আগে সন্দেহভাজন কিছু লোক তাকে অনুসরণ করেছে। নিলয় পুলিশের কাছে সাধারণ অভিযোগ দায়ের করতে গেলে পুলিশ অভিযোগ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় ও তাকে বিদেশে চলে যেতে পরামর্শ দেয়।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কোন নাগরিকের সাধারণ অভিযোগ গ্রহণ করতে পুলিশ বাধ্য। এতে অস্বীকৃতি জানানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু সেসব কেবল কাগুজে আইন। সংবিধানে লিপিবদ্ধ নাগরিক অধিকারের রক্ষাকবচ যেন কেবলই পটে আঁকা ছবি। ক্ষমতাসীন পার্টির ক্যাডার এসে তাদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নেতাদের কোন সমালোচনার অভিযোগ দায়ের করে এক ঘন্টার মধ্যে সমালোচনাকারীকে গ্রেফতার করাতে পারে। এরপর আদালত এক্কা-দোক্কা খেলে অভিযুক্তকে কারাদণ্ড দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নির্দলীয় নাগরিক কোন অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ ভীষণ বিরক্ত হয়। বেশ তো চলছে গ্রেফতার বানিজ্যের বুলবুলি আখড়াই, এখানে আবার এসব অভিযোগ এনে কাজ বাড়ানো কেন! পুলিশ হয়ে পড়ে অভিবাসন উপদেশক। নিলয়কে তারা জিডি করার আইনী অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বিদেশে চলে যাবার পরামর্শও দেয়।

এই যে এতোজন ব্লগারকে হত্যা করা হলো; তার তদন্তের কোন কূল-কিনারা নেই। সন্ত্রাসীরা প্রশ্রয় পেয়েছে, ব্লগার হত্যা তাদের পেশী প্রদর্শন ও ভীতির সংস্কৃতি তৈরীর সুবর্ণ সুযোগ। ধারাবাহিক ব্লগার হত্যার তদন্তে, অপরাধীদের ধরার ক্ষেত্রে কেবল একজন শিখণ্ডী ছাড়া আর কেউ সফল হয়নি। শতভাগ ব্যর্থ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন আইন-শৃংখলা রক্ষার কাজে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হন; তখন ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে ভূমি বাস্তবতার কোন সম্পর্কই নেই বলে মনে হয়। ভ্রান্ত আত্মতুষ্টির কমফোর্ট জোনে বসে জনগণের কাছে সরকারের কোনরকম জবাবদিহিতার তোয়াক্কা না করাই এরকম যুগপত হাস্যকর ও বেদনাদায়ক পদোন্নতির পেছনের কারণ।

পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রে জঙ্গির খোঁজে মাদ্রাসায় তল্লাশী চলছে। যেসব মাদ্রাসা ইংরেজি-অংক-বিজ্ঞানের মত বিষয়গুলো সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যেখানে মাদ্রাসা শিক্ষকেরা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রাখছে বা যেসব মাদ্রসায় জিহাদী বই পাওয়া যাচ্ছে; সেগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারীতে রয়েছে। মাদ্রাসা থেকে ব্যাপক গ্রেফতারেরও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

মুক্তমনা অভিজিৎ রায় হত্যার তদন্তের কোন সন্তোষজনক ফলাফল বাংলাদেশের জনগণ দেখেনি। পাকিস্তানে মুক্তমনা সাবীন মাহমুদ হত্যার দুদিনের মধ্যে অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। সেখানে সর্বদলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের দ্রুত বিচার আদালতে বিচার হচ্ছে; প্রতিদিনই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে জঙ্গীদের। ইউরোপিয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার বাধার মুখেও থেমে নেই মৃত্যুদণ্ড।

ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও অর্থনীতির দেশ পাকিস্তান যদি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে এরকম হার্ড লাইনে যেতে পারে; বাংলাদেশের মত একটি ব্রুট মেজরিটির সরকার ও মধ্যম আয়ের দেশ কেন জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিরো-টলারেন্স দেখাতে পারবে না?

কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে মাঝে মাঝে একটি করে মৃত্যুদণ্ড এবং সরকার সমর্থকদের ‘লিখে রেখো একফোটা দিলেম শিশির’, অর্থাৎ কৃতজ্ঞ করে রাখার এই যে শম্বুক গতির সাফল্যের রকেটের গতির উদযাপন চলছে; আজ নিলয়ের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ সামনে রেখে কী আমাদের মনে হয় না, এ এক নিষ্ঠুর কৌতুকের স্বীকার উপায়হীন জনমানুষ!

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অঙ্গীকার ছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। ভোটাররা সে কারণে তাদের দেশ সেবার (শাসনের) ম্যান্ডেট দিয়েছে। বিচার হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকিলে কী হইতো ভাবুন! এরকম ‘কী করিলে কী হইতো’ হাইপোথিসিসে আমরা যাবো কেন!

আমাদের সামনে সে বর্তমান কালের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরী হয়েছে সেটিও ভয়ংকর বাস্তবতা। নিলয় ছেলেটি অস্ত্র হাতে নিয়ে চাঁদাবাজি করেনি, চাপাতি হাতে নিয়ে জঙ্গিবাজী করেনি। সে কেবল লিখেছে, তার মতামত প্রকাশ করেছে। এই মত প্রকাশের অধিকার তাকে দিতে না পারা, তার হত্যার আশংকার অভিযোগ  গ্রহণে পুলিশের অস্বীকৃতি জানানো এবং তার হত্যার পর রংধনুর মত মৃতদেহের বাসায় পুলিশ উদিত হয়ে বাংলাছবির রুটিন সংলাপ, হত্যার ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত বলা– এ সবই আন্তরিকতা ও যোগ্যতার অভাবের ফলাফল। রাষ্ট্র আগ্রহী নয় মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে উৎসাহিত করতে। প্রতি মাসে একটি করে ১৪ ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যার দেজাভু ফিরে এলেও রাষ্ট্র ঘুমিয়ে থাকে।

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মাথায় টুপি দিয়ে ধর্ম প্রদর্শনের ঝোঁক বাড়ছে। কারণে-অকারণে খর্ব চিন্তার নেতাদের সুস্থতা ও সাফল্য প্রার্থনার মিলাদ-মেহফিলের সংখ্যাও বাড়ছে। জামাত ও বিএনপির কট্টরপন্থীদের আওয়ামী লীগ দলে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে প্রতিদিন। পশ্চাদপদ চিন্তার আমে-দুধে মিশে গিয়ে জনগণকে আঁটি করে ফেলে রাখছে একটি সমন্বিত ক্ষমতাবলয়। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের যে অপকৌশল বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হয়েছিলো, আজ তার চূড়ান্ত সাফল্যের খই যেন চারপাশে ফুটছে।

মুখে মুজিববাদ, আর অন্তরে জিয়া-এরশাদবাদ এবং চর্চায় পাক-সার-জমিন-সাদ-বাদ— এ রকম শঠতার কুরুক্ষেত্রে কে এই নিলয়! প্রজ্ঞাই সমসাময়িক ক্ষমতাচিন্তার চক্ষুশূল; আদৃত অশিক্ষা, ধর্ম আফিম নেশা বিক্রী আর নিরংকুশ আত্মসমর্পণ। ইরাকে যেদিন আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী আত্মপ্রকাশ করে; তার কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে আইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর শপথ গ্রহণের ভিডিওচিত্র প্রকাশিত হয়। কিন্তু ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে’ এই ভ্রান্ত-অধ্যাসে জঙ্গিবাদ নির্মূলের পরিবর্তে ইসলাম ধর্মের চলতি ঠিকাদার হেফাজতের মোল্লা শফির হাটহাজারী যখন জমি উপঢৌকন পায়, আওয়ামী লীগ সঞ্জাত ব্যবসায়ী সালমান এফ. রহমান যখন তার হেলিকপ্টারে ঘোরার স্পন্সর হয়, চট্টগ্রামের নব নির্বাচিত সদাহাস্য মেয়র যখন মোল্লা শফির দোয়া নিয়ে আসে; আমরা বুঝতে পারি নীতিনির্ধারকরা সেই ভারসাম্যের ভিলেজ পলিটিক্সের খেলা থেকে এক পা’ও এগোতে পারেননি।

দেশের প্রান্তিক শিশুদের দারিদ্র্যের শেকলে বেঁধে মাদ্রাসায় পড়ানো হয়। কিছু সংখ্যক কিশোর বড় হলে তারা আরব দেশগুলোতে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর রেকর্ড রিজার্ভের ধারাভাষ্যকার হয়ে যান। আর নব্য এলিট ক্ষমতা কাঠামোর সন্তানেরা দেশের টাকা বাইরে নিয়ে গিয়ে পড়ে সেকেন্ড হোমে বসে, বাপ মরলে তার নির্বাচনী এলাকার জমিদারী সামলানোর প্রস্তুতি নেয়। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের নব্য সামন্ত শ্রেণীর এই প্রান্তিক মানুষকে ঘানি টানিয়ে তাদের চামড়ায় ঢাক বানানোর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করেছিলেন।

আর বাংলাদেশ ব্যবস্থাপনার বেদনাদায়ক দিক হচ্ছে, সব কিছুর বিচার প্রধানমন্ত্রীর কাছে চাইতে হবে। মন্ত্রীগুলো যেন এক একটা দেয়াল, যাদের কানে কথা পৌঁছায় না; আবার সেই দেয়ালগুলোই প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রেখে নিলয়দের মৃত্যু চিৎকার পৌঁছাতে দেয়না। সিদ্ধান্ত নেবার কোন সক্ষমতা নেই কারো। শুধু ভাবমূর্তি দেখেশুনে রাখে; রাজীব, অভিজিত, অনন্ত, নিলয় এদের চাপাতির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মুখগুলোকে ‘নাস্তিক’ ট্যাবুর লালসালু দিয়ে ঢেকে রাখে।

শুধু ব্লগার হত্যা কেন, ধারাবাহিক শিশু হত্যা, সেগুলোকে ঢেকে দিতে পুলিশের ছলচাতুরী, ধরা পড়লে সাময়িক বরখাস্তের পুরোনো নাটক, বিচার না পাওয়া ধর্ষণের অপরাধ, অন্য ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও সর্বদলীয় ঐকমত্য, সাংসদদের সনাতন ধর্মের মানুষের জমি দখলের ‘পাকিস্তান বসন্ত’, নীরবে তাদের দেশত্যাগে বাধ্য করা, এবং সেই একাত্তরের ঘাতক পাকিস্তান প্রশাসনের মতো ডিনাইয়াল সিনড্রোম এসবের মধ্যেও মুখ ঢেকে যায় উন্নয়নের বিজ্ঞাপনে। এই অবিমৃষ্য অন্ধকারে প্রতিদিন মানুষের লাশ গুনে যাওয়ার অন্তহীন ট্র্যাজেডী অবর্ণনীয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই সাম্যভাবনার অসাম্প্রদায়িক সবুজ ব-দ্বীপ রচনা আমাদের দিয়ে হলোনা। আমরা সৌদী আরবের মত এমন এক শিক্ষা-সংস্কৃতিহীন মোহরমুখী স্থূল সমাজ গড়েছি যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের একমাত্র দুর্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও পতন ঘটেছে। কিছু কট্টরপন্থী মুসলিম ছাত্র হিন্দু ছাত্রদের সঙ্গে একই হোস্টেলে থাকতে আপত্তি জানিয়েছে।

পাঁচ বছরে ক্ষমতা সুসংহত করে দ্বিতীয় টার্মে এসেও নাগরিক সমাজের সচেতন কন্ঠগুলোকে ‘চুপ-চুপ-চুপ’ বলে থামিয়ে রাখা হয়। চারিদিকে ষড়যন্ত্র; গণতন্ত্রের স্তম্ভ ধরে নড়াচড়ার জুজু, আগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিগুলো হোক; এ সময় নিলয়ের হত্যার বিচার চাওয়াও যে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র! সুতরাং এখন আমরা সময়ের সাক্ষীগোপাল। মাতৃগর্ভে শিশু নিলয় বুলেটবিদ্ধ হোক! এতে ভবিষ্যতে যখন জঙ্গিরা চাপাতি নিয়ে কোপাতে আসবে, মৃত্যু অনেক সহনীয় হবে নিলয়দের জন্য।

সৌজন্যেঃ নিউজনেক্সটবিডিডটকম

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


× five = 30

নিউজওয়ার্ল্ড৩৬৫ তথ্যসমগ্র

প্রধান সম্পাদক: জগলুল আলম ফোন: ৪১০-৩৩০-১৪৩১
সম্পাদক: আহমেদ মূসা ইমেইল: editor@newsworld365.com
বার্তা সম্পাদক: কৃষ্ণ কুমার শর্মা ইমেইল: newsed@newsworld365.com
ঢাকা অফিস: ০১৭১৯৪০০৯৯২
ইমেইল: nworld365@gmail.com
বিজনেস এক্সিকিউটিভ: সঞ্জিত ঘোষ ইমেইল: accounts@newsworld365.com
জনসংযোগ: আলী আকবর ইমেইল: news@newsworld365.com
ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত তথ্য: nworld365@gmail.com
অফিস: ৩৩-২৯ স্ট্রিট-১৩ , লং আইল্যান্ড সিটি, এনওয়াই ১১১০৬